সুলেখক শেখর ভারতীয়-এর কথাতে শোনা যাক এক আত্মকথন।
দেখবেন স্কুল-কলেজে কিছু ছেলেমেয়ে থাকে রোগা, মোটা, খুব কমন শ্রীহীন মুখ, আলাদা করে যাদের চেহারার কোনও আকর্ষণ নেই, কথায় একটা টান নেই, হঠাৎ করে যাদের প্রেমে কেউ পড়ে না। কিন্তু এরা প্রেমে পড়ে, স্কুল কলেজ কোচিংয়ের সুন্দরী মেয়ে বা চটকদার ছেলেটির প্রেমে পড়ে এরা৷ চুপচাপ, গভীর এক অঙ্কের প্রেম। যে প্রেমের ভাগ অন্য কারও নেই, যে প্রেম এদের একার৷ আমি বরাবর এই ছেলেমেয়েদের দলে। এইরকম ছেলেমেয়েদের একটা নিজস্ব গল্প থাকে, আর থাকে কয়েক’শ মুহুর্ত। যে বান্ধবী প্রেমিকা হতে পারত তার বান্ধবী থেকে যাওয়ার মুহুর্ত। যে ছেলেটা বর হতে পারত তার প্রেমের ডেটে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে যাওয়ার মুহুর্ত। কোনও এক গভীর রাতে বাড়িতে একা রুমে ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দের সঙ্গে চোখ ভিজে আসার মুহুর্ত।
– কী রে, প্রেমে পড়েছিস নাকি?
এই প্রশ্ন ‘দূর আমি আর প্রেম’ বলে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার মুহুর্ত। সেই ছেলেটা বা সেই মেয়েটার আমাদের ছেড়ে এগিয়ে যাওয়ার মুহুর্ত, এরকম অসংখ্য মুহুর্ত আমরা সারাজীবন নিজেদের কাছে গচ্ছিত রেখে দিই। আমার মতো কেউ কেউ হয়ত বা সেটাকে গচ্ছিত রাখে ডায়রিতে।
আমি বিশ্বাস করি এই পৃথিবীতে একদিন হয়ত পরমানু বোমা থাকবে না, একদিন না খেতে পেয়ে ঘুমনো থাকবে না, একদিন হয়ত ভোট এলে মানুষের খুন হয়ে যাওয়া থাকবে না, কিন্তু প্রেম থাকবে। গোটা বিশ্বে মানুষের সর্বকালীন সবচেয়ে বড় আবিষ্কারের নাম ‘প্রেম’। অতীতে ছিল, আজ আছে, আগামীতেও থাকবে…
আমি বিশ্বাস করি ২০৫০ সালে ইসরোর স্পেস-ট্যাক্সিতে বসে পৃথিবী থেকে মহাকাশে ঘুরতে যাওয়ার পথে এক যুবক তার প্রেমিকাকে পড়ে শোনাবে ‘আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস। দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস’ কিংবা ‘হর এক বাত পে কহতে হো তুম কে তু কয়া হ্যায়? তুমহি কহো কি ইয়ে অন্দাজে গুফৎগু কয়া হ্যায়…’
আমাদের ছোটবেলাটা বেশ অন্যরকম ছিল, আলাদা ছিল ছোটবেলার প্রেমগুলোও। এখনকার মতো ফেবু, হোয়াটসঅ্যাপ ছিল না। যখন তখন পিং করা যেত না। আমরা বরং টিউশানি ফেরৎ মেয়েটির পেছনে সাইকেল নিয়ে টিং টিং করে বেড়াতাম। প্রথম একবছর তো খালি লুকিয়ে দেখতাম মেয়েটিকে। তারপর একটু সাহস করে তার কাছে খাতা চাইতাম, বা সেই হয়ত খাতা চেয়ে বসত। এইভাবে শুরু হত আলাপ। তারপর রোজ টিউশন বা স্কুল থেকে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে বাড়ি ফেরা। আর যারা সেম টিউশনে পড়তাম না বা পরিচয় থাকত না, তারা দাঁড়িয়ে থাকতাম মেয়েটির স্কুল যাওয়া আসার রাস্তায়। সেই সারাদিনে দুবার কি একবার দেখতে পাওয়া কোন অংশেই ‘দেশপ্রিয় পার্কের সবচেয়ে বড় দুর্গা’ দেখার থেকে কম আনন্দের ছিল না। মেয়েটি হয়ত জানতই না রাস্তায় জটলা করে দাঁড়ানো ছেলেগুলির মধ্যে কে ওকে ভালবাসে, কিংবা কারা ওকে ভালবাসে!
তাতে অবশ্য আমাদের কিছু যেত আসত না। বন্ধুরা বাপের সম্পত্তি ভেবেই নিজেদের মধ্যে ওকে “বৌদি” ডাকা শুরু করে দিত। এক ক্যারাম ঠোকা বিকেলে হঠাৎ খবর আসত, আর বাপস, এই মাত্র বৌদিকে দেখলাম নীল চুড়িদারটা পরে ফুচকা খেতে বেরিয়েছে। চল চল চল, আড্ডা ফেলে দৌড়।
বন্ধুর আবদার,
-ভাই আজকের ফুচকার বিল কিন্তু তোর।
গিয়ে হয়ত দেখতাম নীল চুড়িদার বটে, কিন্তু ওটি পরে বেরিয়েছে মেয়েটির দিদি। ব্যস যে বন্ধুটি ফুচকার লোভে খবর দিয়েছিল, তাকে ক্যালানো শুরু সবাই মিলে।
কখনও কখনও প্রেমিকা পাড়ার মেয়ে হত। তখন গলির ক্রিকেট কাজে আসত। খেলতে খেলতে তার বাড়িতে ছয় মেরে বল ঢোকানো, তারপর বলটা আনতে গিয়ে এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে খুঁজতে থাকা। কখনও দেখা পাওয়া কিংবা খালি চোখে ফিরে আসা। এভাবেই চলতে চলতে একদিন রকে আড্ডা দেওয়ার সময় হঠাৎ মেয়েটির বাবা চলে আসত,
-বাবা সামনের মাসে পম্পার বিয়ে। তোমরা তো ওর দাদার মতো (ক্ষেত্র বিশেষে ভাইয়ের মতো), তা একটু হাতে হাত লাগিয়ো, বুঝতেই পারছো কাজের বাড়িতে ছেলে লাগে….
মেয়েটির বাবার এরকম কথা শুনে আমরা বিয়ার-বার দৌড়াতাম না। চুপ করে যেতাম, কদিন খুব কাঁদতাম। কদিনের জন্য হাতের তাগা, গলার লকেট খুলে নাস্তিক হয়ে যেতাম। তারপর যে খামে ভরে প্রেমপত্র দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম সেরকমই একটা খামে কয়েকটা নোট বা একটা গিফট ভরে বিয়ের যৌতুক দিয়ে আসতাম।
প্রিয় মেয়ে/ছেলেটির অজান্তে বিচিত্র সব কাজ করতাম, যেমন তার ‘হাতের লেখা’ জেরক্স করে নিজের কাছে রেখে দেওয়া। সে কোনদিন চকলেট দিলে তার প্যাকেটটা, কখনো বা চকলেটটা জমিয়ে রাখা। আবার যারা প্রেমে আর একটু এগোতে পারতো, যাদের কয়েকদিনের জন্য হলেও প্রেমটা হত তারা নিজের প্রেমিক প্রেমিকার দেওয়া গোলাপ ডায়রির পাতার ভাঁজে জমাতো। আমার স্থির বিশ্বাস, আমাদের সময়কার সেই ক্যাবলাকান্ত ছেলেগুলো হয়ত আজ সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, ডাক্তার, WBCS, শিক্ষক হয়ে গেছে! হয়ত এখন পিটবুল, শাকিরা, লুইস ফঁনসে শোনে। আজ তাদের আশেপাশে পরীদের ভিড়ও হয়ত রয়েছে। কিন্তু তাদের বইয়ের তাকে অগোছালো যত্নে রাখা একটা পুরনো ডায়রির পাতা খুললে আজও গোলাপ পাওয়া যাবে।
আচ্ছা এখনকার প্রেমিক/প্রেমিকারা ডায়রিতে গোলাপ কুড়োয়?
আমাদের এই গোলাপ কুড়ানো ডাইরিটা, আমাদের এই প্রেমের মুহুর্তগুলো আমি দু’মলাটে আনার দুঃসাহস করলাম। আমাদের অনেকের স্কুল-কলেজের প্রেমগুলো দু’মলাটে আপনাদের সবার জন্য
আসন্ন ‘কলিকাতা পুস্তকমেলা ২০২৫’-এ লেখকের দ্বিতীয় বই, কবিতার বই, ‘পাহাড় ছিল তোমার প্রিয়’, ‘কচি পাতা’-এর মাধ্যমে প্রকাশ পেতে চলেছে।
সেই সমস্ত ছেলেমেয়েদের জন্য যারা আজও ডায়রির ভাঁজে গোলাপ জমায়, কিংবা মনে…
| Weight | 0.2 kg |
|---|---|
| Dimensions | 30 × 10 × 2 cm |
| binding | Hardcover |
| language | Bengali |
| publisher | KOCHIPATA |






There are no reviews yet.